বৃহষ্পতিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১২

ভোলাহাট উপজেলার ইতিহাসের আদিপর্ব - ৭

পাল যুগে গৌড় বঙ্গে তথা গৌড় শহর ও এর সন্নিহিত অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের খুব একটা প্রভাব ছিল না বলে ইতিহাস হতে জানা যায়। এ অঞ্চলে হিন্দু ও ব্রাহ্মনেরই বসবাস ছিল অধিক।

পাল রাজারা ছিলেন পরম সৌগত বা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী। অত্যন্ত ধার্মিক ও ন্যায় বিচারক। কথিত আছে পাল বংশীয় ১৪তম রাজা রাম পাল দেবের (১০৯১ - ১১০৩ খ্রিঃ) ছেলে যক্ষ পাল দেব জনৈক রমনীর প্রতি অন্যায় আচরণ করায় তিনি তাকে (নিজ ছেলেকে শূলে দিয়ে) মৃত্যুদন্ড দেন। ফলে রাজরাণী ও পুত্র বধু শোকে দুঃখে ব্রহ্মপুত্র নদে আত্মহুতি দিয়েছিলেন।

রাজা ধর্মপাল দেব বিক্রমশীলা নামক মহা বিহার স্থাপন ও ব্যয়ভার নির্বাহের জন্য প্রচুর জমি দান করেন। রাজা এখানে ৬টি বিদ্যালয় স্থাপন করেন শিক্ষা দানের জন্য। ১০৮ জন পন্ডিত নিয়োগ করেন। ছাত্ররা বিনা মূল্যে আহার পেত।

সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনও ছিল খবই উজ্জল। সে যূগে প্রাকৃত ভাষায় রচিত “গৌড় বহো” নামক কাব্য প্রণেতা কবিবর বাকপতি, তা রচনা করেন। সুভট নামক কবি যুবরাজ ত্রিভূবন পালের উৎসাহে “দুতাঙ্গদ” নামক ছায়া নাটক সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন।

ধর্মপাল দেবের ঐতিহাসিক “খালিমপুর লিপির” কবির নাম তাম্র ফলকে পাওয়া যায় নি। তবে শিল্পীর নাম জানা যায়। লিপিটি ভোগটের পৌত্র সুভটের পুত্র গুণশালী তাতট কর্তৃক উৎকীর্ণ হয়। সংস্কৃত ভাষায় রচিত ছায়া নাটক “দুতাঙ্গদ” এর রচয়েতা কবি সুভট কি তাম্রশাসন উৎকীর্ণকারী গুণশালী তাতকের পিতা? যদি তাই হয়, তবে সংগত কারণেই ধরে নিতে পারি ধর্মপাল দেবের দান সংক্রান্ত তাম্রপট্টলিপিটির (খালিমপুর লিপি) কবির নাম ‘সুভট’।

এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, ভোলাহাট উপজেলার বিস্তৃর্ণ ভূভাগ নদী ও নদী বাহিত পলি দ্বারা গঠিত। অতীতে এর অধিকাংশ এলাকা ছিল যেমন জলাভূমি, তেমনি পরবর্তী সময়ে কয়েকটি গ্রাম ছাড়া সমগ্র অঞ্চল ছিল জঙ্গল ভূমি। এ সমস্ত জঙ্গলে বাঘ, বন্য শুকর, শেয়াল, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণীর ছিল অভয়ারণ্য। সম্ভবতঃ এ কারণেই অষ্টম শতাব্দীতে এ এলাকার মন্ডলের নাম করণ হয়েছিল “ব্যাঘ্রতটী মন্ডল” উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় যে, ১৯৬০ সালের দিকেও ভোলাহাটের বিভিন্ন স্থানে বাঘ হত্যার ঘটনা ঘটে।

পাল, সেন, পাঠান ও সুলতানী আমলে এ অঞ্চলের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম ছিল জলপথ। প্রাচীন কালে এ এলাকার বিভিন্ন বর্ধিষ্ণু গ্রাম, বা প্রত্যন্ত পাড়ার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতো ছোট বড় অসংখ্য খাল। যাত্রী পরিবহনসহ পণ্য আনা নেয়ার ক্ষেত্রে জলযানই ছিল একমাত্র ভরসা। আর সে যুগে গ্রাম, পাড়া হাট গড়ে উঠতো সাধারণতঃ নদীর ধারে। প্রত্যান্ত পল্লী-গ্রাম বা পাড়ার সাথে সংযুক্ত থাকতো অসংখ্য খাল। আর খালগুলি সংযুক্ত থাকতো নদীর সাথে। ঐতিহাসিক খালিমপুর গ্রামের পাশ দিয়েও এক বিশাল খালের অসি-ত্ব আজো বিদ্যমান। খালটি মানকি নামক স্থান হতে শুরু করে পাটমোন্না নামক স্থান দিয়ে খালিমপুর মূল গ্রামের উত্তর দিক দিয়ে প্রাচীন কালের নদী, এক সময়ের ছাটিয়া ভাটিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছে। এমনি আরো একটি খাল চাপখারী হলদেগাছী হয়ে গোহালবাড়ীগ্রামের উত্তর দিক দিয়ে ইমামনগর গ্রামের সন্নিকটে সুন্দ্রাবাড়ীর দিকে গোহালবাড়ী ও কুমিরজান গ্রামকে দু’ভাগ করে বিল ভাতিয়ায় প্রবেশ করেছে।

অন্য একটি শাখা দু’বীরেশ্বরপুরকে ভাগ করে সুরানপুরের মধ্য দিয়ে পূণরায় বিলভাতিয়ার সাথে মিলিত হয়েছে। অপর দিকে ৪ নম্বর জামবাড়ীয়া ইউনিয়নের বিখ্যাত খাল “খরবরো” বিলভাতিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা হতে শুরু হয়ে পুরণদহ দিয়ে দূর্গাপুর, কৃষ্ণপুর, বড়গাছী ও বড় জামবাড়ীয়া হয়ে চলে গেছে গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালা অভিমূখে। এর অন্য একটি শাখা বড়গাছী হাটের সন্নিকটে দুভাগ হয়ে একটি শাখা চলে গেছে ক্ষীর নদী সাগর নামের একটি বিশাল বিলে। এ বিলটি ছিল এক সময়ে বিখ্যাত “ক্ষীর নদী” বলে জানা গেছে। এটিও কর্ণখালী ও মির্জাপুর (শিবগঞ্জ উপজেলা) মধ্য দিয়ে বিলভাতিয়ার সাথে সংযুক্ত হয়েছে। সুতরাং আজকের বিলভাতিয়া অতীতের বিশাল নদী এবং ঐতিহ্যসিক গৌড় বঙ্গের রাজধানী গৌড় শহরের বিখ্যাত নদী বন্দর। যা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিচার্য্য যে, ধর্মপালদেবের তাম্র শাসনে বর্ণিত অসংখ্য জোলক, জোটিকা, খাটক, খাটিকা, স্রোতিকা, গঙ্গিনিকা, দীপিকা প্রভৃতির তথা ভোলাহাটের অসংখ্য খাল, বিল, জলা, দ্বীপ এর যথেষ্ট মিল খুজে পাওয়া যায়।

সেন আমলে ভোলাহাট-এর ৪নং জামবাড়ীয়া ইউনিয়নের ব্রাহ্মনগ্রাম (আধুনিক আদমপুর), কৃষ্ণপুর, দূর্গাপুর, কালিনগর প্রভৃতি এলাকা অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী লোকালয় হিসেবে গড়ে উঠে। আদমপুর গ্রামের নব নির্মিত ওয়াক্তিয়া মসজিদ সংলগ্ন স্থানে একটি প্রাচীন কূপের সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়াও তৎসংলগ্ন স্থানে বাড়ী ঘর তথা প্রাচীন ইমারতের অস্তিত্বও বিদ্যমান। সেন আমলে রাজা ক্ষিতিসুর ব্রাহ্মনদের ২৮টি গ্রাম দান করেন বলে জানা যায়। বোধ করি দানকৃত গ্রামগুলির মধ্যে ব্রাহ্মনগ্রামসহ উল্লিখিত গ্রামগুলির অন্যতম।

এখানে মুকুট রাজার বাড়ী ছিল বলে ঐ এলাকার জনশ্রূতি হতে জানা যায়। এছাড়াও কালু গাজী- চম্পাবতীর উপ্যাখান ও কাহিনী শুনা যায়। অনেকে এ স্থানকে চম্পক নগরী বলেও উল্লেখ করেছেন।

ভোলাহাট উপজেলার খালিমপুর, ভবানীপুর, গোহালবাড়ী, মধুপুর, সুরানপুর ও চামুশা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে পূর্বে বেশ কিছু উচু ঢিঁবির অস্তিত্ব ছিল। এখনো কিছু কিছু স্থানে ঢিঁবির অস্তিত্ব বিদ্যমন। পাল, সেন ও সুলতানী আমলে এ সমস্ত ঢিঁবিতে রাজধানী গৌড় নগরীকে রক্ষার জন্য অগ্রবর্তী সৈন্যদল এর সেনা ছাউনি ছিল। এছাড়া কিছু কিছু লোকালয় সন্নিহিত ঢিঁবিতে গ্রাম বা লোকালয়ের শানি- শৃঙ্খলা রক্ষার্থেও সেনা বাহিনীর ছাউনি স্থাপিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

চামুশা গ্রামের উত্তরে ভারত-বাংলাদেশ সীমানে-র আনর্-জাতিক রেখা বরাবরে ১৯৮নং মেইন পিলারের প্রায় ৩’শ গজ পূর্বে “ছিড়াগড়” অবস্তিত। এটি বর্তমানে ভারতের দখলে। এটি একটি পুরাকীর্তি সমৃদ্ধ স্থান।

সুলতানী আমলে ভোলাহাট উপজেলার সর্ব পশ্চিমের সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম চামুশা ছিল চামড়া শিল্পের জন্য বিখ্যাত স্থান। রাজধানীর যাবতীয় টেনারী শিল্প বা চামড়া এখানে সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াকরণ করা হতো। এ কারণে এ গ্রামের নামকরণ হয়েছে চাম+উসা = চামুশা। বলে কিংবদন্তী রয়েছে। উল্লেখ্য, প্রাচীনকালে সাধারণত চামড়াকে সিদ্ধ বা গ্রামীন ভাষায় উসিয়ে প্রক্রিয়াকরণ বা সংরক্ষণ করা হতো। চামুসা এলাকাটি ছিল চামড়া শিল্পের জন্য সুলতানী আমলে বিখ্যাত নৌ বন্দর বলে জনশ্রূতি রয়েছে। অতীতের গঙ্গা বা বর্তমানের বিলভাতিয়ার সাথে এ গ্রামের পশ্চিম পাড় ঘেষে একটি বিশাল খাল এ স্থানের সাথে সংযোগ রক্ষা করতো। যার আলামত হিসেবে আজো খালটির অস্তিত্ব বিদ্যমান। যদিও এর বড় অংশ ভরাট হয়ে গেছে।

উপজেলার আলালপুর গ্রামের দক্ষিণ পাশে মূল রাস্তার উভয় পাশে আলালপুর গ্রামে “আলাল ঢিঁবি” অবস্তিত। এ আলাল ঢিঁবিটিও এক বিশাল অতীত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন হিসেবে এটি সমাধিক চিহ্নিত।

ভোলাহাট উপজেলার ইতিহাসের আদিপর্ব -৬

ধর্মপাল দেবের দানকৃত গ্রামসমূহ ও কিংবদন্তীঃ
কোন কোন ক্ষেতে জনশ্রুতি বা কিংবদন্তী যে সত্যে পরিণত হয়, খালিমপুর গ্রামে প্রচলিত কিংবদন্তী -ই এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। বহুকাল ধরে খালিমপুরবাসী বলে আসছিল যে, খালিমপুর বিবি ফাতেমার (মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর কন্যা) দানী জমি। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় যে, সত্যি সত্যিই প্রমাণিত হল যে, খালিমপুর দানী ভূমি। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ও প্রমাণই হচ্ছে রাজা ধর্ম পাল দেবের (৭৮৫ - ৮২০ খ্রিঃ পর্যন্ত রাজত্বকাল) দানপত্র বা তাম্রশাসন। যেটি ঐতিহাসিক খালিমপুর লিপি নামে পরিচিত। তবে এ ক্ষেত্রে বিবি ফাতেমা কর্তৃক দানকৃত নয়, তা ২য় বৌদ্ধ রাজা ধর্ম পাল দেব কর্তৃক দানকৃত নিস্কর দেব ভূমি।

উল্লিখিত কিংবদন্তীটি সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে ব্যপক প্রচার পায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। ভোলাহাট ছিল পাক হানাদার মূক্ত অঞ্চল। ঐ সময় খালিমপুর ও তৎসংলগ্ন এলাকার সাধারণ মানুষেরা প্রচার করেছিল খালিমপুর যেহেতু বিবি ফাতেমার দানী জমি, কাজেই এখানে কোন শত্রু সৈন্য আসতে পারবে না। বাস'বেও ঘটেছিল তাই। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সমগ্র এলাকা ছিল হানাদারমুক্ত।

গোহালবাড়ী এলাকায় প্রাচীনকালে রাজাদের গরু চারণ ভূমি বা বাথানবাড়ী ছিল। এ কিংবদন্তীটিও ধ্রুব সত্য। রাজা ধর্মপাল দেবের দানকৃত দেব ভূমির অন্তর্ভূক্ত ছিল গো চারণ ভূমি “গোহালবাড়ী”। এ কারণেই এ স্থানের নাম করণ হয়েছে গোহালবাড়ী।

জাগলবাড়ীর ঢিঁবিটি শত শত বছর ধরে মনি ঋষিরা বাস করতো। হিন্দু ধর্মমতের এখানে একটি বিশাল ঐতিহ্যবাহী মন্দির ছিল। অত্যন্ত জাক জমকের সহিত শত শত বছর ধরে পূজা অর্চণা হতো। দূর দূরান্ত হতে ধর্মপ্রাণ মানুষেরা এখানে এসে পূজা দিত। কিংবদন্তীটিও শত শত বছর ধরে চলে আসছে। এ কিংবদন্তটিও বাস্তবেই সত্য। জাগলবাড়ীতে ছিল একটি ঐতিহাসিক দেব মন্দির। যার অস্তিত্ব পাক শাসনামল পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। পাল ও সেন আমলে অত্যন্ত জাক জমকপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্থান হিসেবে স্থানটি অতি প্রসিদ্ধ ছিল। যা নানা বর্ণনা, অবস্থান ও সাক্ষ্য প্রমাণে তাই পাওয়া যায়। মুসলমান শাসনামল হতে এর জৌলুস কমতে থাকে। এক পর্যায়ে নির্জন নিঝুমপুরী ও জঙ্গলাপূর্ণ ভৌতিক পরিবেশ ধারণ করে। কাজেই উল্লিখিত তিনটি কিংবদন্তীই যে সত্য তা ধর্মপাল দেবের ভূমি দান সংক্রান্ত তাম্রপট্টলিপিই তা প্রমাণ করেেছ। এ ছাড়া নানা বর্ণনা, অবস্থান, ভূপ্রকৃতিসহ বিভিন্ন যুক্তি, তত্ব তথ্য উপাত্ত ও পর্যবেক্ষণ হতে অন্তত এ বিষয়টি অতি পরিষ্কার যে, ধর্মপাল দেবের দানকৃত দেবভূমিই আজকের ভোলাহাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কিছু গ্রাম বা এলাকা।
তাম্রপট্টলিতে বর্ণিত দানকৃত ৪টি গ্রাম, পাটক বা পাড়া ও হট্টি বা হাট কোথায় অবস্তিত ছিল? বর্তমানে ঐ সমস্ত স্থান, গ্রাম, পাড়া বা হাটের পরিবর্তিত নাম কি হয়েছে, তা বলা মুসকিল। তবে কিছু আদি নাম ও শব্দ আজও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে, তা পূর্বেই বর্ণনা করা হয়েছে। তাম্রলিপিতে বর্ণিত গ্রামের সীমাও আজ প্রায় ১২’শ বছর পরে মিলানো সম্ভব নয়। তবে ভোলাহাট উপজেলার আদী জনবসতী ধরতে গেলে ভবানীপুর, খালিমপুর, হাড়িয়াবাড়ী, সুরানপুর আলালপুর, গোহালবাড়ী ও ভোলাহাটসহ তৎসন্নিহিত এলাকাকেই বুঝাই।

ধর্মপাল দেবের তাম্রপট্টলি বা তাম্রশাসনে বর্ণিত গ্রামগুলির কিছু নাম, চিহ্ন ও আলামত হিসেবে কিছু কিছু স্থান সহজেই চিহ্নিত করা যায়। সে কালের গ্রাম, বিষয় ও মন্ডল সম্পর্কে বিভিন্ন যুক্তি, ভৌগলিক অবস্থান ও নমুনা বিচার বিশ্লেষণ করে সহজেই সিদ্ধান্তে উপনিত বা একমত হওয়া যায় যে, তাম্রপট্টলিতে বর্ণিত “শুভস'লী ” যেখানে রাজা ধর্ম পাল দেবের মহাসামন্তধিপতি শ্রী নারায়ণ বর্মা দেবালয় নির্মাণ করেেিছলেন তার বর্তমান নাম “জাগলবাড়ী”। এর পাশ দিয়ে এক সময়ে নদী প্রবাহিত হতো। অতীতে এ ধরণের বিখ্যাত কিছু নির্মাণ এবং গ্রাম বসতী গড়ে উঠতো সাধারণ নদী বা বড় খালের ধারে। কেন না সে যুগে একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম ছিল নৌপথ। দেবগৃহও ঐ কারণেই বর্ণিত স্থানে নির্মিত হয়েছিল বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। এলাকাটি বর্তমানে ২৬ নং মৌজা। পাল আমলে যে কোন স্থাপনা মাটির উঁচু ঢিঁবি স্থাপন করে নির্মিত হতো বলে বাঙালীর ইতিহাস গ্রন্তু আদিপর্ব নিহার রঞ্জণ রায় বাবু’র লেখা হতে জানা যায়। সে সূত্রে বলা যায় শুভস'লীতে (জাগলবাড়ীতে) নির্মিত দেবগৃহটিও

অনুরূপভাবে জলাভূমিতে মাটির স'প তৈরী করে নির্মাণ করা হয়ে ছিল। কথিত আছে যে, ধর্মপাল রাজার মহাসামন্ত অধিপতি শ্রী নারায়ণ বর্মাও অনুরূপভাবে ঐ জলাভূমিতে বিভিন্ন স্থানের মাটি কেটে এনে ঢিঁবি বা স'প নির্মাণের পর ভগবান নন্নু নারায়ণের দেবগৃহ (মন্দির) নির্মাণ করেন। দেবগৃহ নির্মাণের পর এ স্থানটির সম্ভবতঃ নতূন নামকরণ করা হয় শুভ +স্থান = শুভস্থান যা সংস্কৃত ভাষায় শুভস'ল্যাং হয়। শুভস'লী নামকরণে শুভস'ল্যাং বা শুভ স্থান অথবা “পূণ্যস্থান” বিশেষণটিও সংগত কারণেই চলে আসে মর্মে অনুমান করা হচ্ছে।

তাম্রপট্টলীতে বর্ণিত “ক্রৌঞ্চশ্বভ্র” ছিল অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু ও- ধনজন পূর্ণ সমৃদ্ধশালী গ্রাম। যা তাম্রপট্টলীতে গ্রামের সীমা বর্ণনা হতেই আত্ম প্রকাশ ঘটেছে। তাম্র শাসনে বর্ণিত ঐ গ্রামের উত্তরে যে, “কাদম্বরী দেবকুলিকা” অর্থাৎ স্বরস্বতী দেবীর মন্দিরের কথা উল্লেখিত আছে, তার অস্তিত্ব ১৯৭১ সাল অবধি বিদ্যমান ছিল। ভবানীপুর মৌজার উত্তরে নাককাটি তলায় যে, নাককাটি দেবী মূর্তি ও মন্দির ছিল, তা মূলত স্বরস্বতী দেবীরই মূর্তি। এ মূর্তিটির কথা পূর্বেও পন্ডিত রজনীকান্ত চক্রবর্তী বাবুর গৌড়ের ইতিহাস গ্রন্থের ৬২নং পৃষ্ঠায় উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণিত হয়েছে। এ আলামত ও বর্ধিষ্ণু গ্রামের সীমা বর্ণনা হতে অনুমান নয়, বরং প্রমাণিত হয় যে, তাম্রপট্টলীতে বর্ণিত ক্রৌঞ্চশ্বভ্র গ্রামই আজকের ভবানীপুর এলাকা। যা ভোলাহাট থানার ২৩ নম্বর ভবানী পুর মৌজা।

তাম্র শাসনে বর্ণিত মাঢ়াশালল্মী গ্রাম বলতে অনুমিত হয় যে, এটি বর্তমানের খালিমপুর গ্রাম। এ গ্রাম হতেই ইতিহাস বিখ্যাত পাল যূগের সর্ব প্রাচীন বহুল আলোচিত ও বর্তমান অধ্যয়ের মূল বিষয়বস' ঐতিহাসিক খালিমপুর লিপি পাওয়া যায়। অনুমান করা হচ্ছে যে, এ গ্রামেই রাজা ধর্মপাল দেবের মহাসামন্তাধিপতি শ্রী নারায়ণ বর্মার আবাসস'ল ছিল। এ মর্মে জনশ্রুতিও রয়েছে। খালিমপুর গ্রামের আলামত, পরীক্ষা নিরিক্ষা ও অবস্থান নির্ণয়ে অন্ততঃ তাই প্রমাণিত হয়। খালিমপুর গ্রামের কবরস্থান ও এর পূর্ব দিকের উঁচু ভূখন্ড মূলতঃ একই জমি। রাস্তা নির্মাণকালে এ ভূখন্ডটিকে দু’ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। ১৯৮২ সালে রাস্তা নির্মাণকালে (মাটি খননকালে) একটি বিশাল ইন্দারা, বড় বড় সুপ্রশস' ইমারতের গৌড়িয়া ইটের ভিত্তি ও বেশ ক’টি চৌবাচ্চা আবিষকৃত হয়। এ স্থানের ঠিক পশ্চিম পাশে বড় খান গাজীর মাজারের দক্ষিণে রয়েছে একটি পুকুর। এ পুকুরের পূর্ব পাড়েছিল গৌড়িয়া ইটের ও টালীর সাহায্যে নির্মিত শান বাঁধানো ঘাট। এর অসি-ত্ব সামান্যতম হলেও অদ্যবধি বিদ্যমান রয়েছে। তাম্র শাসনে বর্ণিত উত্তরে গঙ্গিনিকার সীমা যা মরা নদী বা খালকে বুঝায়, তা আজো বিদ্যমান। কাজেই এ সমস্ত আলামত হতে সহজেই সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায় যে, উল্লিখিত স্থানটিই মহা সামন্ত অধিপতি নারায়ণ বর্মার আবাস স'ল ও মাঢ়াশালল্মী গ্রাম। বর্তমানে এ স্থানটি অত্র উপজেলার ২২নং খালেআলমপুর মৌজা। তাম্রশাসনে বর্ণিত গোপিপ্পল্লী গ্রামের নামটি আজও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। যা

আজকের গোপিনাথপুর গ্রামকে বুঝায়। বর্তমানের বাহাদুরগঞ্জ ও গোপিনাথপুর গ্রামকে মধ্যবর্তি রাস্তা দ্বারা বিভাজন করেছে, অতীতে এ রাস্তাটিই ছিল গ্রামটির ঠিক উত্তরে বলে অনুমিত হয়। এর রাস্তাটিই ছিল গো চারণ ভূমিতে যাওয়ার একমাত্র গো পথ বলে অনুমান করা হচ্ছে। এটি বর্তমানের ১৩ নম্বর গোপিনাথপুর মৌজা। এলাকাটি পাল আমলে স্থালীক্কট বিষয়ের অধিন আম্রষন্ডিকা মন্ডলের অনর্-গত ছিল। আম্রষন্ডিকা শব্দটির মধ্যে আমের ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, এ অঞ্চল ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলগুলি বহুপূর্ব হতে বিখ্যাত ফল আমের জন্য বিখ্যাত।

পালিতক গ্রাম বলতে গ্রামটির বর্ণনানুযায়ী বীরেশ্বপুর ও সুরানপুর এলাকা বুঝায় বলে অনুমিত হয়। গ্রামটির উত্তরে গঙ্গিনিকা বলতে মরা নদী বা খালকে বুঝায়। বর্তমানে বীরেশ্বরপুর মুসলিমপুর গ্রামের উত্তর ওপশ্চিম পাশদিয়ে যে খাল প্রবাহিত হয়েছে তাম্রপট্টলীতে বর্ণীত পালিতক গ্রামের সীমার গাঙ্গিনীকা বা খাল ও পশ্চিমে জেনন্দায়িকা বা জোলা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এছাড়া গ্রামটির বর্ণিত পূর্ব প্রান্তে কোন্ঠিয়া স্রোতঃ বলতে সুন্দ্রাবাড়ীর সন্নিকটবর্তী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত খড়স্রোতা খালকে বুঝানো হয়েছে বলে অনুমান করা যায়। এটি বর্তমানে এ উপজেলার ৬নং সুরানপুর মৌজা।

রাজা ধর্মপাল দেবের তাম্রশাসন খ্যাত “তলপাটক” বা তলপাড়া বলতে অনুমান করা হচ্ছে যে, এ পাড়াটি খালিমপুর গ্রামের সর্ব দক্ষিণে তালপুকুর নামক স্থানটিকে সম্ভাব্য পাড়া হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। একটি বিশাল প্রাচীন পুকুর এ স্থানে বিদ্যমান। এর চতুর দিকে এঁটেল লাল মাটির উঁচু ভূমি বিস্তৃর্ণ এলাকা জুরে বিস্তৃত। এ স্থানে দাঁড়ালেই কেমন যেন এক প্রাচীনত্বের গন্ধ নাকে ছোঁয়া দেয়। পুকুরের চতুর পাড়ে প্রাচীন বসতীর ছাপও লক্ষণীয়।

দান ভূমির অনর্-গত হট্টি বা হাট কোথায় ছিল, এ নিয়ে নানা প্রকার প্রশ্ন ও যথেষ্ট মতভেদের অবকাশ রয়েছে। তবে অনেক পন্ডিত ব্যক্তি ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা তাম্রশাসন বর্ণিত হট্টি বা হাট বলতে গোহালবাড়ী গ্রামের সর্ব দক্ষিণে হাঁড়িয়াবাড়ী নামক স্থানকে চিহ্নিত করেছেন। সরজমিনে পর্যবেক্ষণ, অবস্থান ভূপ্রকৃতি, সর্বপরি পুরাতন বা বয়বৃদ্ধ মানুষদের স্বাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ঐক্যমতে পৌছা যায় যে, আলোচ্য হট্টি বা হাটটি অতীতে এ স্থানেই বসত। এ স্থানে রয়েছে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট পুকুর। আশ পাশে আরো কয়েকটি পুকুরের অসি-ত্ব সম্পর্কে অবহিত হওয়া গেছে। প্রচুর ইট খোলা ইততস' ছড়ানো ছিটানোর আলামত বিদ্যমান। সর্বপরি প্রাচীন যুগে সাধারণতঃ হাট বাজার গড়ে উঠতো পরিবহনের সুবিধার্থে সম্পুর্ণ রূপে নদীর ধারে। এ ক্ষেত্রে এ স্থানটি এর ব্যতিক্রম নয়। এর দক্ষিণে পূর্ব-পশ্চিমমূখী হয়ে ঐতিহাসিক বিল ভাতিয়া অবস্তিত। এটি ছিল একটি বিশাল নদী। আর বিল ভাতিয়া সেই নদীরই একটি পরিত্যক্ত খাত বা জলাভূমি, যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং সর্বদিক বিচার বিবেচনা করে এ স্থানেই যে হাট ছিল তা ঐক্যমতে পৌঁছা যায়। তবে হাট এর

আশপাশে যে বসতী ছিল না এমন কথাটি উড়িয়ে দেয়া যায় না। এ স্থানে প্রাচীন বসতীর আলামতও বিদ্যমান রয়েছে, যা অস্বীকার করা যায় না।

ধর্মপাল দেবের তাম্র শাসনের আলোচ্য পর্বে উল্লিিিখত বিষয়গুলির অবস্থান ও নামকরণ যে সবই সত্য, বাস্তব ও নিখুঁত তা কিন্তু নয়। সবই নানা আলামত, যুক্তিতর্ক, অবস্থান, পর্যবেক্ষণ ও অনুমান তথ্য উপাত্তের ওপর নির্ভরশীল। ভ্রমও হতে পারে। একে বারেই নিখুঁত নিক্তিতে ওজন ও কষ্ঠি পাথরে যাঁচাইকৃত নয়। আর এ বিষয়গুলি আজ প্রায় ১২’শ বছর পর একশ ভাগ সত্য ও বাস্তবের ওপর দাঁড় করাণোও সম্ভবপর নয়। তাই এ জন্য প্রয়োজন আরো ব্যপক পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান।

যাই হোক, ধর্মপাল দেবের ভূমি দান সংক্রান্ত তাম্রশাসনটিতে রূপায়িত বাংলার যে সুন্দর রূপ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গ্রাম, পাড়া, হাট, ঘাট, নদী, খাল, বিল, জলা, আইল, খেজুর গাছ, লেবু বনসহ কোন কিছুই বর্ণনা হতে বাদ পড়েনি। এ ছাড়া পাল রাজাদের বংশকুল পরিচয়, রাজার পরাক্রম শক্তি, দানশীলতা, পরধর্ম ও পরমত সহিষ্ণুতা, পারষ্পরিক সমঝোতা, রাজ্যের সীমা, ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয় সর্বপরি রাজতন্ত্রেও গণতন্ত্র চর্চা যে কিছুটা বিদ্যমান ছিল এর একমাত্র স্বাক্ষর ধর্মপাল দেবের খালিমপুর লিপি। এছাড়া দানপত্র হিসেবে এটি একটি অমর দলীল। দলীল লেখকের নাম বর্তমান যামানার ন্যায় উৎকীর্ণ থাকা সত্যই বিষয়গুলি বিষ্ময়কর এবং ব্যপক গবেষণার দাবীদার বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। এ কারণে ধর্মপাল দেবের এ তাম্রপট্টলীকে শুধু তাম্রশাসন বলা বোধ করি সঠিক হবে না বরং এটিকে সাহিত্যাতিহাস ও দান পত্রের পরিপক্ক দলীল হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। অর্থাৎ সাহিত্য, ইতিহাস ও দানপত্র সমন্বিত তাম্রলিপি বলাই শ্রেয় বলে আমার অভিমত।

পাল রাজ বংশের সুদীর্ঘকাল শাসন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে জানা যায়, সেই যূগে সমগ্র রাজ্যময় ছিল সুখ শানি- আর সমৃদ্ধিতে ভরা। স্বাধীন ধর্মাচর্চা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গন ছিল অত্যন্ত গৌরব মন্ডিত। পাল রাজারা ছিলেন যেমন অহিংস নীতিয়ানুসারী ঠিক তেমনী পরধর্ম ও মত সহিষ্ণু। নিজেরা বৌদ্ধ হলেও ধর্ম সমাজে পর ধর্মের প্রতি তারা ছিলেন পরম উদার। পাল রাজাগণ হিন্দু ব্রাহ্মনদের পূজোর জন্য মন্দির ও বিগ্রহ স্থাপন এবং দেব সেবার জন্য বিস্তর ভূমি দান করেন দেবালয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য।

পাল আমলের এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ১৪টি দানপত্র সংক্রান্ত তাম্রশাসনের মধ্যে ২/১টি ছাড়া অধিকাংশ দান পত্রই হিন্দু ব্রাহ্মনদের প্রদান করা হয় বলে ইতিহাস প্রমাণ দেয়। ঐ সমস্ত দানে পীড়িত ব্যক্তিদের আশ্রয় ও সেবা দানসহ চিকিৎসা ব্যবস্থা করারও নির্দেশ দেয়া হতো। এতে প্রমাণিত হয় যে, এটি অতীতে একটি আদর্শ রাষ্ট্র ছিল।

ভোলাহাট উপজেলার ইতিহাসের আদিপর্ব - ৫

ভূপৃষ্ঠ হতে প্রায় ২০ ফুট উঁচু ৮০ হতে ৯০ বিঘে জমির উপর ছিল পূর্ব পশ্চিম লম্বা বিশাল একটি ঢিঁবি। এ ঢিঁবির দক্ষিণে ৩টি স্থানে ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির পুকুর। পুকুর পাড় শান বাঁধানো ঘাট ছিল। ঢিঁবির পশ্চিম পাড়ে ছিল মূল মন্দির ঘর। গৌড়িয়া ইটের সাহায্যে নির্মিত ছিল মন্দির। নানা বর্ণের কারুকার্য্য খোচিত ইট ও পোড়া মাটির ফলক (পোড়া মাটির মূর্তি) দ্বারা সমগ্র মন্দির অলংকৃত ছিল। মন্দিরের মধ্যস'লে বসানো ছিল কালো পাথরের বেদী। বেদীটির চর্তুদিক ছোট ছোট মূর্তি দ্বারা খোদিত ছিল। পাকিস্থান আমলের গোড়ার দিকে মূল মন্দিরের দেওয়াল প্রায় দুই হাত পর্যন্ত উচু অস্তিত্ব বিরাজমান ছিল। পূজা অর্চণা করতে দেখা যেত তবে তার বহু পূর্ব হতে ঢিঁবিটি ছিল বিশাল জঙ্গলে পরিপূর্ণ। বিষধর সাপ খোপসহ হিংস্র প্রাণীর আবাস ভূমি হিসেবে পড়ে ছিল শত শত বছর। ভয়ে মানুষ যেত না তার ধারকাছে। এমন কি গবাদী পশুও যেত না সেখানে। ১৯৬৫ সালেও সে স্থান হতে খালিমপুর গ্রামের মজ্জুমপুর পাড়ার লোকেরা একটি বিশাল আকৃতির অজগর সাপ ধরে এনেছিল।

চারি দিকে বিল। বছরের অধিকাংশ সময়ই বর্ষা ও বন্যার জল জমা হয়ে থাকতো সেখানে। দূর হতে দ্বীপের মত দেখাতো ঢিঁবিটি। ইট পাথর হরণকারীদের অত্যাচার, লোক সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ক্রমাগত চাষাবাদ যোগ্য জমি চাহিদার কারণে ঢিঁবিটির ঝাড় জঙ্গল পরিষ্কার ও কেটে ছেঁটে প্রায় সমতল করে ফেলেছে। তবুও সামান্য হলেও এর অস্তিত্ব অদ্যবধি টিকে আছে। ভোলাহাট-কানসাট রোডের ভাতিয়ার বিলের পূর্ব প্রান্তে সোনাজল নামক স্থান হতে ঠিক ১ কিঃ মিঃ উত্তর পূর্বমূখী হয়ে দাঁড়ালে মাত্র অর্ধ কিঃ মিঃ পূর্ব দিকে আজো স্বগৌরবে ধর্মপাল দেবের মহাসামন্তাধিপতি নারায়ণ বর্মার অমর কীত্তি, প্রাচীন শুভেস'লীর ঢিঁবিটি সহজেই চোখে পড়ে।

রাজশাহী’র ইতিহাস গ্রন্থের প্রণেতা কাজী এম. মিছের ঐতিহাসিক জাগলবাড়ীকে মনসাতলা বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন জাগলবাড়ী ঢিবি সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, পুরাকালে ধনপতি বণিক কালীদহ সুন্দর নদী পথে গৌড়ে যাতায়াত করতেন। এক সময় গৌড়াধিপতি ধনপতি বণিককে বলেছিলেন “আপনি কেমন সওদাগর” যদি আমার বিলভাতিয়া বিলে আপনার দেশ হতে মাটি এনে বাড়ী বানাতে পারেন! চাঁদ বণিক নাকি তাই করেছিলেন। এখন বিলভাতিয়ার বিলে যে মনসাতলা বা ভিটা আছে তা ধনপতির বাড়ী বলে অনেকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে থাকেন। ঐতিহাসিক কাজী এম. মিছের ভ্রম বশতঃ আরও উল্লেখ করেছেন যে, ঐ মনসাতলা বা ভিটার অদূরে খালিমপুর গ্রামে গুপ্ত যুগের তাম্রলিপি পাওয়া গেছে। প্রকৃত পক্ষে খালিমপুর গ্রাম হতে পাওয়া যায় পাল আমলের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল দেবের তাম্রলিপি। যা ইতিহাসে বিখ্যাত খালিমপুর লিপি নামে পরিচিত। তবে একটি বিষয়ে কাজী এম. মিছের সত্য উৎঘাটন করেছেন যে, খালিমপুর এক সময় যে নদীর তীরে বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল তা বিলভাতিয়ার অবস্থানই প্রমাণ করে। তার বর্ণিত কালিদহ সুন্দর হয়তোবা পাল যুগে কালিন্দি নদী এ বিলভাতিয়ার খাত দিয়ে প্রবাহিত হতো। একথার সত্যতা অনেক ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য বর্তমানেও ভোলাহাট উপজেলার অধীন গুলদহ বিলের অনতি দূরে কালিদহ নামের একটি বিল আজও বিদ্যমান। কাজী এম. মিছের বর্ণিত মনসাতলার যে নামকরণ হয়েছে এ বিষয়টিও আংশিক সত্য যে, প্রকৃত পক্ষে সে স্থানে পুজা হতো। কিন্তু মনসা পুজা না হলেও যে বহুকাল ধরে সে স্থানে পুজা হতো বা পুজার জন্য বিখ্যাত ছিল অন্ততঃ সে প্রমাণটিই প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। এক্ষেত্রে তাঁর ধারণা অমূলক নয়। কেননা শত শত বছর ধরে ঐ স্থানটি পরিত্যাক্ত থেকে নিঝুমপুরী বা জঙ্গলে রূপ লাভ করেছিল। ফলে এখানে প্রচুর সাপ-খোপসহ হিংস্র জন্তুর আখড়ায় পরিণত হয়। আর বহুকাল ধরেই এ স্থানে পুজা হতো, সে কারণেই হয়তো তিনি মনসাতলা বলে ঐ স্থানটিকে আখ্যায়িত করেছেন।

সংগত কারণেই সে সূত্র ধরে আজও এ অঞ্চলে ধণপতি সওদাগরের লোক কাহিনী গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের মুখে কাহিনী আকারে শুনা যায়। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ঐ ঢিঁবিতে বেশ কিছু শিমুল গাছ, কয়েকটি বট ও পাইকর গাছ এবং কিছু উলুঁ খাগড়সহ বিন্দ্যার ঝোঁপ বিদ্যমান ছিল। উত্তরে ৩টি পুকুরের অস্তিত্ব আজো বিদ্যমান। শিমুল ও পাইকর গাছের (পাশাপাশি) নিচে মূর্তি খোদিত বেদীটি পড়েছিল। এর চতুর দিকে কারুকার্র্য্যময় বিভিন্ন সাইজের গৌড়িয়া ইট ও পাথরের ভগ্নাংশ আর পোড়া মাটির মূর্তি ভাংগা ভাংগা অংশ পড়েছিল। ঢিঁবিটির উত্তর দিকে একটি রাস্তা উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ঢিঁবিটির সংগে সংযুক্ত ছিল। যা আজো চোখে পড়ে। এ রাস্তাটিই সেই প্রাচীনকালে একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম বলে প্রতিয়মান হয়। রাস্তাটি বর্তমানের খালিমপুর ও ভবানীপুর এর সাথে সংযুক্ত ছিল একথাটি নির্দিধায় বলা যায়। ১৯৮৫ সালে খালিমপুর গ্রামের শলেমান আলী’র ছেলে আঃ সালাম জাগলবাড়ীর ঐ ঢিঁবি হতে একটি গরু গাড়ী ভর্তি গৌড়িয়া ইট এনেছিল। ইটগুলিতে দেব দেবীর মূর্তি খোদায় করা ছিল বলে মোসাঃ সাহিদা খাতুন, জং- মরহুম নজর আলী, সাং- খালিমপুর (বর্তমান বয়স ১০০ বছর) তা প্রত্যক্ষ করে বর্ণনা করেন। যে দিন ঐ ইটগুলি আনা হয় সে রাতেই এক অজানা ভয়ে সমস্ত বাড়ী থমথমে হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল কে যেন তাদের প্রাণ নাশের ভয় দেখাচ্ছে। পরদিনই আবার আনিত ঐ ইটগুলি জাগলবাড়ীর ঢিঁবিতে ফেলে আসে। ১৯৮৭ সালে প্রচন্ড শিলা বৃষ্টিতে ঐ এলাকার বোরো ধানের ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার প্রেক্ষিতে তৎকালিন উপজেলা চেয়ারম্যান আঃ সামাদ ও আমি পর্যবেক্ষণ কাজে ঐ ঢিঁবিতে যায়।

সেখান হতে এ লেখক একটি পাথরের তৈরী গাঁজার কোল্কি পায়। সে সময় ঐ ঢিঁবিতে কারুকার্য্য খচিত ইট, রঙ্গিন টালির ভগ্নাংশ ও কিছু চিনা মাটির রঙ্গিন নক্সা কাটা তৈজস পত্রের ভগ্নাংশ প্রত্যক্ষ করেন। ১৯৯২ সালে ঐ স্থানের পাশে একটি ক্যানেল কাটার সময় ময়ামারী গ্রামের কিছু লেবার বেশ ক’টি তামা ও ব্রঞ্জ মিশ্রিত হাতের বাউটি ও একটি দেগের কড়া মাটির নিচ হতে উদ্ধার করে। অলংকার গুলি সোনার ভেবে লেবারদের মাঝে লেগে যায় তুলকালাম কান্ড। একই বছর খালিমপুর গ্রামের মরহুম কাঁচু শেখের ছেলে হাসেন আলী ২টি ছোট আকৃতির কড়ি ভর্তি হাঁড়া ও একটি বিশালাকৃতির মাটির (খালি) হাড়া উদ্ধার করে। ছোট হাঁড়া ২টি সেখানেই ভেংগে ফেলা হয়। বড় হাঁড়াটি হাসেন আলী বাড়ী নিয়ে আসে। হাঁড়াটি আজো হাসেন আলীর বাড়ীতে অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।

কড়ি ভর্তি হাঁড়া উদ্ধারের বিষয়ে সে যুগের অর্থনৈতিক বিষয়ে অবগত হওয়া যায় যে, পাল আমলে পণ্য ক্রয় বিক্রয় ও রাজস্ব প্রদানের ক্ষেত্রে কড়ির ব্যপক ব্যবহার ও প্রচলন ছিল। সে যুগের খুচরা মুদ্রা বা বিনীময়ের মাধ্যম হিসেবে কড়ি ব্যবহৃত হত যা, রজনীকান্ত বাবুর গৌড়ের ইতিহাস গ্রন্থে পাল যুগের দেশের অবস্থা পর্বের সাথে পুরোপুরি মিল রয়েছে। জাগলবাড়ীর এই ঢিঁবি হতে অনেকে প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণালংকার কুড়িয়ে পেয়েছে। খালিমপুর গ্রামের পানু শেখ, পিং- এসমাইল শেখ প্রায় ৮/১০ বছর পূর্বে এক খন্ড সোয়াভড়ি ওজনের স্বর্ণালংকার ও একটি স্বর্ণ মূদ্রা কুড়িয়ে পায়। অলংকারটি মাছ ধরার ঘূর্ণি জালের কাঠির মত। যা মাদুলী অলংকার হিসেবে আদিযুগের মহিলারা ব্যবহার করতো। এর মধ্য দিয়ে ফুটো করা ছিল তাতে সূতো দিয়ে ব্যবহার করা হত। অলংকারের উপরে চারটি পাত দ্বারা গিল্টীকরা ছিল। আবার গিল্টী করা প্রতিটি পাতে চারটি করে টিকলী বসানো ছিল।

প্রায় ১০/১৫ বছর পূর্বে নিমগাছী গ্রামের মরহুম সেফাতুল্লাহ একটি ছোট সোনার ফলা কুড়িয়ে পায় বলে জানা যায়। গত ২০০২ সালে কে বা কারা রাতের অন্ধকারে ঢিবিটির দক্ষিণ প্রান্তে প্রায় ৭/৮ ফুট গর্ত করে কোন মূল্যবান ও দূর্লভ প্রত্ন সম্পদ চুরি করে নিয়ে গেছে। অতীতে এ ঢিঁবিকে অনেকে ভ্রমবশতঃ জগদ্দল মহা বিহার বলেও আখ্যায়িত করতো। জাগলবাড়ীর ঐ ঢিঁবিতে পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা দেব বিগ্রহের বেদীটি ঐ জমির মালিক নাকি ইট ও মাটি চাপা দিয়ে কোথাও ঢেঁকে রেখেছেন বলে শুনা যায়। তাই জাগলবাড়ীর ইতিহাস প্রসিদ্ধ প্রাচীন শুভেস'লীর এই ঢিঁবিটি খনন করলে বেরিয়েও যেতে পারে অনেক চেপে থাকা ইতিহাস। যা কালের নিরব স্বাক্ষি হিসেবে সাক্ষ্য দিতে পারে। আর কালের তাগিদে ঐতিহাসিক রহস্য উদঘাটনে বিষয়টির ব্যপক তথ্যানুসন্ধান, গবেষণা ও উৎখনন অত্যন্ত জরুরী বলে ইতিহাস প্রেমি, মানুষ মনে করেন।

ভোলাহাট উপজেলার ইতিহাসের আদিপর্ব - ৪

পাল যুগে দানকৃত জমির গোচারণ ভূমিও দেব ভূমির আনর্-ভূক্ত হতো। একারণে সম্ভাবত বর্তমান ভোলাহাট উপজেলার ২নং গোহালবাড়ী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড গোহালবাড়ী (যা ধর্মপাল দেবের তাম্রশাসন প্রাপ্তির উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত) গ্রামের নাম করণ হয়েছে, “গোহালবাড়ী”। ধর্মপাল দেবের তাম্রশাসন ছাড়াও অন্যান্য পাল রাজাদের জমি দান সম্পর্কিত তাম্রপট্টলিপিতে, গোবাট, গোমার্গ (গোপথ) ছাড়াও গাংনিকা, যানিকা, দ্বীপিকা, খাটিকা, খাটক, জোলা, জোলক প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।

পাল যুগের রাজারা দেবতার সেবা ছাড়াও পীড়িত ব্যক্তিদের আশ্রয় দানসহ গ্রামের শানি- শৃঙ্খলা রক্ষার ভারও দান গ্রহীতার ওপর ন্যাস্ত করতেন। এছাড়া গো চারণ স্থানে, গ্রামস্থ আম্রমধুক বৃক্ষে (সুমিষ্ট মোহুয়া/সুস্বাদু আম ফলের গাছ, আম গাছ) নিম্ন ও পতিত ভূমিরও রাজস্ব আদায়ের অধিকার দান গ্রহীতাকে দেয়া হতো। ধর্মপাল দেবের তাম্র শাসনে আম্রষন্ডিকা মন্ডল, আম্রযানকোর্লাদ্ধযানিকা প্রভৃতি স্থানের নাম ও শব্দ পরিদৃষ্ট হয়। এতে আম্র শব্দটির সাহায্যে আমের জন্য বিখ্যাত বলেই উল্লিখিত স্থান সমূহের নামের সংগে আম্র শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আর এ কথা অমুলক নয় যে, অত্র ভোলাহাট অঞ্চল বহুপূর্ব হতেই আম ও রেশমের জন্য বিখ্যাত। এ থেকে সহজেই প্রমাণিত হয় যে, আদী যুগেও অত্রাঞ্চল বর্তমানের মত আমের জন্য বিখ্যাত ছিল বলে অনুমিত হয়। অনুরূপ ব্যঘ্রতটী মন্ডল শব্দ ও নামে প্রকৃত পক্ষে ভোলাহাট -এর আদিযুগে ভূপ্রকৃতির বর্ণনার সাদৃশ্য রয়েছে।

আদি যুগে হাতেগনা কয়েকটি গ্রাম ছাড়া সমগ্র এলাকা ছিল বন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। বাঘ, ভাল্লুকসহ হিংস্র প্রাণীর আবাসস্থল ছিল এটি। এ এলাকায় জনতা কর্তৃক বাঘ শিকার কাহিনী আজো শুনা যায়। বাঘ শিকারের কিছু স্মৃতি আজো কয়েকটি বাড়ীতে বিদ্যমান। এ এলাকার জঙ্গলে এত বাঘ বাস করতো ১৯৩০ হতে ৪০ এর দশকে ও বজরাটেক এলাকায় অসংখ্য এবং পাঁচটিকরী এলাকায় ১২টি বাঘ ও ১টি নীলগাই হত্যা করা হয়। পাঁচটিকরী গ্রামের মনিরুল, পিং- ফাইজুদ্দিন এর বাড়ীতে আজো একটি বাঘের মাথার কংকাল (খুলি) রক্ষিত আছে। তাম্রশাসনে অসংখ্য প্রাচীন গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রামের আকার ও আয়তন সর্বত্র এক ধরণের ছিল না। ছোট বড় নানা আয়তন ও আকারের গ্রাম ছিল। ছোট গ্রামের পরিচয় ছিল পাটক (পাড়া) হিসেবে। ষষ্ঠ শতাব্দীর দামোদরপুর তাম্র পট্টলিতে দু’টি পাটকের নাম পাওয়া যায়। একটি পুরাণবৃন্দিক হরি- পাটক, অপরটি স্বচ্ছন্দ পাটক। বগুড়া জেলায় প্রাপ্ত প্রথম কুমার গুপ্তের বৈগ্রাম তাম্র শাসনে ত্রিবৃতা ও শ্রী গোহালী নামে দু’টি পাটকের নাম পাওয়া যায়। একই শাসন সূত্রে জানা যায়, সাধারণতঃ গ্রাম গড়ে উঠতো নদী বা অন্য ধরণের জলাশয়ের ধারে, সেখানে কৃষি কাজের জন্য উপযুক্ত ভূমি এবং যাতায়াত সুবিধা থাকতো। এভাবে গড়ে উঠা গ্রাম শিল্প বানিজ্যে, শিক্ষায় ও সংস্কৃতিতে গুরুত্ব পেত।

অনেক সময় রাজা বা তার কোন প্রতিনিধিকেও এই শ্রেণীর বর্ধিষ্ণু গ্রামে বাস করতে দেখা যেত। যেমন খালিমপুর লিপিই প্রমাণ করে রাজা ধর্মপাল দেবের মহাসামন্ত অধিপতি নারায়ণ বর্মা মাঢ়াশাল্মলী গ্রামে বাস করতেন। কেন না তিনি আরো অন্য কোন স্থানে দেবালয় স্থাপন করতে পারতেন। কিন' যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে স্বভূমির প্রতি টান বা দূর্বলতা চিরায়ত নিয়মানুযায়ী থাকতো। এ ক্ষেত্রের তার ব্যতিক্রম ঘটে নি। মাঢ়াশাল্মলী গ্রামের আধূনিক নাম খালেআলমপুর বা খালিমপুর বলে মনে করা হয়। তবে বর্তমানের খালিমপুর গ্রাম যে স্থানে বিদ্যমান, তার পূর্বে অবস্থান ছিল ঐ গ্রামের ঠিক পশ্চিমে ভোলাহাট - কানসাট রোড সংলগ্ন করবস্থান ও এর আশে পাশে। ১৯৮১ সালে ঐ সমস্ত স্থানে রাস্তার মাটি কাটার সময় ইটের তৈরী ইন্দারা, সুপ্রশস্থ দালানের ভিত ও চৌবাচ্চা আবিস্কৃত হয়। এর পশ্চিমে যেখানে বড়খান গাজীর মাজার, এর দক্ষিণে একটি প্রাচীন পুকুর বিদ্যমান। এ পুকুরটির শান বাঁধানো (গোড়িয়া ইট ও টালীর) ঘাটই এ ঐতিহ্য বহন করে। বর্তমানের পূকুরের পূর্ব প্রান্তে ঐ ঐতিহ্যটি কিছুটা হারিয়ে গেলেও চিহ্ন বিদ্যমান। ইট পাটকেল আজো ঐ স্থানে প্রথিত রয়েছে। উল্লিখিত আলামত হতে সহজেই প্রমাণিত হয় যে, ধর্মপাল দেবের শাসনামলে ঐতিহ্যবাহী মাঢ়াশাল্মলী গ্রামটিই আজকের খালিমপুর। ইন্দারা ও দালানের ভিতই প্রমাণ করে যে, এখানে ধর্মপাল দেবের মহাসামন্তধিপতি নারায়ণ বর্মার আবাস গৃহ ছিল। এমন আলামত আর কোথাও অদ্যবধি পাওয়া যায়নি।

খালিমপুরের সুউচ্চ কবরস্থানে কবর খনন কালে অতীতে সিলপাটা, ওজন মাপের বাটখারা (পাথরের) ও মাটির সানকি পাওয়া গেছে। পাল আমলে গ্রাম গুলি ছোট হোক আর বড়ই হোক, বর্ধিষ্ণু হোক আর নাই হোক, সব গ্রামই দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি বাস্থ ভূমি (বসতবাড়ী) অপরটি ক্ষেত্রভূমি (চাষভূমি)। এ দু’ভাগ ছাড়াও গ্রামে থাকতো গো চারণ ভূমি, গর্ত ভূমি, উষর ভূমি এবং গোপথ বা গোমার্গ ভূমি। গোচর বা গোচারণ ভূমির অবস্থান ছিল কৃষি জমির ধারে। গ্রামের সীমা ঘেষে গ্রামের ভেতর পর্যন্ত ছিল গোপথ, গোমাগ বা গোবাট। প্রথম কুমার গুপ্তের বৈগ্রাম তাম্র শাসনে শ্রী গোহালী নামের একটি পাটক বা পাড়ার নাম পাওয়া যায়। শ্রী গোহালী ছিল গোচারণ ভূমি নচেত গোপথ। এমনিভাবে ধরে নেয়া যায় যে, ধর্মপালের তাম্রশাসন প্রাপ্তি স্থান খালিমপুরের উত্তর পশ্চিমের গোহালবাড়ী গ্রাম তাম্রশাসন খ্যাত গোচারণ ভূমি অথবা গোপথ। আর এ থেকেই ঐ গ্রামের নাম করণ হয়েছে গোহালবাড়ী এ কথা ঐতিহাসিক সত্য। আদি যুগে ঐ এলাকায় গরু চরাণো হতো বা বাথান বাড়ী ছিল বলে এখানো একটি কিংবদন্তী ঐ গ্রামটি সম্পর্ক্যে প্রচলিত আছে।

 যাই হোক, পাল যুগে কোন কোন গ্রামে হট্ট বা হাট ছিল। প্রায় প্রতিটি গ্রামেই খাল, বিল, জোলা, জোলক, জোটিকা, খাট, খাট্য, খাটিকা, খাড়ি, খাড়িকা, খানিকা, স্রোতিকা, দীপ্ত, দীপিকা, গাঙ্গিনিকা, উষর হজ্জিক ও পুস্করিণী ছিল। তাম্রশাসনে উল্লিখিক ও বর্ণিত প্রতিটি নামই খাল বিল নদীনালায় ভরা বাংলার নদী মাতৃক পরিবেশকে স্মরণ করায়। বলা বাহুল্য নামগুলির (শব্দগুলি) অধিকাংশই আবিকৃত অবস্থায় প্রচলিত রয়েছে। জোলা, খাড়িশব্দ আজো এ অঞ্চলে প্রচলিত। অনতি প্রসর খাল বুঝাতে উল্লিখিত শব্দগুলি বুঝায়। জেলিক বা জোটিকা জোলা শব্দের সমার্থক। অনুশাসনে বর্ণিত খাড়ি মন্ডল সম্ভবত খাল বহুল জনপদ অর্থেই ব্যবহৃত হতো। খানিকা স্রোতিকা, গাঙ্গিনিকাও খাড়ির সমার্থক। মরা নদীর খাত গাঙ্গিনিকা নামে এখনও পরিচিত। উল্লেখ্য, দলদলী ও জামবাড়ীয়া ইউনিয়নের মধ্যবর্ত্তি স্থানে, গুলদহবিল সংলগ্ন স্থান আজো গাংনির বিল নামে পরিচিত। এটিও একটি মরা নদীর পরিত্যক্ত খাত।

পাল আমলে গ্রামের বাইরে গোচারণ ভূমির পাশেই বন বা অরণ্য ভূমি থাকতো। ধর্মপালদেবের খালিমপুর তাম্রপট্টলিপিতে ক্রৌঞ্চশ্বভ্র গ্রামের সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। গ্রামটির পশ্চিম দিকে গাঙ্গিনিকা (মরা নদী) উত্তর দিকে দেবকুল (দেউল) পূর্ব-উত্তরে আলি (সেতু) আমার মনে হয় আইল বুঝাতে আলি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। গিয়ে শেষ হয়েছে লেবু বনে। গ্রামে বসবাসকারী কায়স্ত, মহামহত্তর প্রভৃতি বিষয় ব্যবহারী এবং করণ ক্ষেত্রকর নামক পেশাজীবির পরিচয় সম্পর্কেও অবহিত হওয়া যায়। লিপির ভাষ্যে আরো জানা যায়, এই বিষয় ব্যবহার জীবি এবং পেশা জীবিদের সর্ব পূজনীয় ছিলেন গ্রামের ব্রাহ্মনেরা। মাৎস্যর ন্যয় যূগ হতে পরিত্রাণ পেতে সামন্তগণ ও সাধারণ পুজাপুঞ্জকর্তৃক গোপাল দেব কে রাজা নির্বাচিত করার ইতিবৃত্ত, সে যুগেও রাজতন্ত্রের মধ্যে অতি সামান্য হলেও গণতন্ত্র যে বিরাজিত ছিল, ধর্মপাল দেবের তাম্রশাসনই তার প্রমাণ দিচ্ছে। সেই সময় সামন্তাধিপতি নারায়ণ বর্মা হয় তো বা গোপাল দেব কে রাজা নির্বাচিত করতে সহায়তা করে ছিলেন বা প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন, অথবা গোপাল দেব বা তাঁর পুত্র ধর্মপাল দেবের খুবই অনুগত/বিশ্বস্ত ছিলেন বলে মহা সামন্তাধিপতি নারায়ণ বর্মা কর্তৃক নির্মিত দেবালয়ে পূজা অর্চণার জন্য খুশি হয়ে রাজা, যুবরাজ ত্রিভূবন পালের মধ্যস্থতায় ৪টি নিস্কর গ্রাম দান করেছিলেন বলে মনে হয়। রাজকার্য্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার্থে যে ২৬টির বেশী প্রধান বা অধ্যক্ষ নিযুক্ত করার বিষয়ে ও উল্লেখ করাটিই প্রমাণ করে যে, রাজতন্ত্র ও রাজ্য অত্যন্ত সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সে যুগে পরিচালিত হতো। প্রয়োজনে সবাইকে অবগত পরামর্শ ও সম্মতি নেয়া হতো। সৃষ্ট পদসমূহের বিশেষ বিশেষ ক্ষমতা ও রাজতন্ত্রের প্রতি বিশেষ কর্তৃব্য ছিল। তাম্রপট্টলিপিতে সমূদয় পদের অধিকার স্পষ্ট বুঝা যায় না।

পন্ডিত রজনীকান্ত বাবু’র মতে- রাজপুত্র ভবিষ্যতে রাজা হবেন, সুতরাং তাঁকে সমূদয় বিষয় জানানো ও প্রয়োজনীয় স্থলে তাঁর সম্মতি নেয়া হতো। রাজগণের নিম্নে রাজনকের সম্মান ছিল। ক্ষমতা সম্পন্ন ভূস্বামীদের রাজনক বলা হতো। দন্ড শক্তিক, দন্ড প্রদান করতেন। দন্ড পাশিক, দন্ড দানের যন্ত্রাদির অর্থাৎ শূল খড়গাদির তত্বাবধায়ক ছিলেন। দৌঃ সাধিক অর্থ দ্বার পাল। গমাগমিক ও অভিত্বরমান কিংবা গমাগমিকাভিত্বরমান, দ্রুতগামী বার্তা বাহকের অধ্যক্ষ ছিলেন। তরিক, নৌ বাহিনীর অধ্যক্ষ। নাকাধক্ষ্য ও গৌল্মিক, শান্তি রক্ষার্থে রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন অংশে স্থাপিত সেনা দলের অধ্যক্ষ ছিলেন। খাদ্য দ্রব্যের সরবরাহের কাজ ছিল ভোগপতির। প্রত্যেক “বিষয়ের” হিসেব রাখার জন্য যে কার্য্যালয় ছিল, বিষয়পতি তার অধ্যক্ষ ছিলেন। বিষয় কার্য্যালয়ে জমি জমার পরিমাণ ও রাজস্বের হিসেবও থাকতো। ষষ্ঠাধিকৃত রাজস্ব সংগ্রাহক ছিলেন। মহাসামন্তাধিপতি, সামন্তদের তত্বাবধায়ক ছিলেন। মহামত্তরের অধিন বহু কর্মচারী থাকতো। দশ গ্রামের রাজস্ব সংগ্রহের জন্য দশ গ্রামিক নিযুক্ত হতো। তাঁরা জ্যৈষ্ঠ কায়স্থের অধিন ছিল। এছাড়াও গৌড় লেখমালার লেখক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র মতে, হসি- বাহিনী (হাতি) প্রতি পালককে হস্তযধক্ষ, অশ্ব বাহিনীর প্রতি পালককে অশ্বধ্যক্ষ। গরুর প্রতিপালককে গবাধ্যক্ষ। মহিষ প্রতি পালক কে মহিষাধ্যক্ষ। ছাগল প্রতিপালক কে ছাগাধ্যক্ষ। মেষ (ভেড়া) প্রতিপালক কে মেষাধ্যক্ষ বলা হল। গৌড়ের ইতিহাসের লেখক পন্ডিত রজনীকান্ত চক্রবর্তী বাবু মনে করেন, ধর্মপাল দেবের মহাসামন্তাধিপতি নারায়ণ বর্মা ছিলেন জাতিতে ক্ষত্রিয়।

প্রাকৃত ভাষায় “গৌড় বহো” নামক কাব্য প্রণেতা কবিবর বাকপতি শেষ সময়ে ধর্মপালদেবের রাজ সভার শোভা বর্ধন করেন। খালিমপুরের প্রাচীন নাম শুভেস্থলী বলেও রজনীকান্ত বাবু মনে করেন। কিন' ব্যপক তথ্যানুসন্ধান, সরজমিনে পর্যবেক্ষণ, কিংবদন্তী ও বর্তমান জনশ্রুতি মোতাবেক ধর্মপাল দেবের মহা সামন্তাধিপতি নারায়ণ বর্মা বর্তমান জাগলবাড়ী নামক স্থানে (আদি নাম শুভেস্থলী) দেবালয় নির্মাণ করেন। সুস্পষ্ট প্রমাণ ও আলামত পাওয়া গেছে। যা বর্তমানেও বিদ্যমান। ধর্মপাল দেবের তাম্র শাসন প্রাপ্তিস্থান, খালিমপুর গ্রামের ঠিক দক্ষিণে (প্রায় দেড় কিঃ মিঃ দক্ষিণে) এর অবস্থান। জে.এল. নম্বারানুসারে ২৬ নম্বর জাগলবাড়ী মৌজায় এর অবস্থান। বহুপূর্ব হতে ঐ স্থানটি যোগী বাড়ী, জঙ্গলবাড়ী, জগদ্দলবাড়ী নামে পরিচিত ছিল বলে লোক মূখে শুনা যায়। যোগী, মুনি ঋষিরা সেখানে বাস করতেন বলেও নানা ব্যাখ্যা ও বর্ণনা শুনা যায়। শত শত বছরের প্রাচীন পূজা স্থল হিসেবে স্থানটি কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে।

বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২

ভোলাহাট উপজেলার ইতিহাসের আদিপর্ব - ৩

গৌড়ের পূর্ব দিকস্থ ভাতিয়ার বিলের ধারে অবসি'ত একটি উচ্চ ভূ-খন্ডে অবসি'ত খালিমপুর গ্রাম হতে প্রাপ্ত এ তাম্রশাসনে পাল বংশ কুল পরিচয় সুন্দরভাবে বর্ণনা দিচ্ছে যে, দয়িত বিষ্ণুর পুত্র বপ্পট, বপ্পট হতে গোপাল দেবের জন্ম। গোপাল দেবের মহীষির নাম (স্ত্রীর) দেদ্দ দেবী। অর্থাৎ দেদ্দ দেবী ধর্মপাল দেবের মাতা।

 অন্য একটি তাম্রশাসন (মুঙ্গেঁর হতে প্রাপ্ত তাম্রশাসন) হতে জানা যায়, ধর্মপাল দেব, রাষ্ট্রকুট রাজ পরবলের (শ্রী বল্লভের) কন্যা রান্না দেবীর পানি গ্রহণ করেন। অর্থাৎ ধর্মপাল দেবের স্ত্রী’র নাম রান্না দেবী। বাক পাল তার ছোট ভাই। পাল পর্বে ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধির কারণে ধর্মপাল দেবের সময় রাজ্য সীমা আরো বিস-ৃতি লাভ করেছিল বলে আনুমানিক ৮০৭ খ্রিঃ উৎকীর্ণ খালিমপুর তাম্র শাসন স্বাক্ষ্য দিচ্ছে।

তাম্রশাসনের পাঠ উদ্ধার করে ঐতিহাসিক রজনীকান্ত বাবু তাঁর গৌড়ের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ধর্মপাল দেব অত্যন্ত পরাক্রমশালী নরপতি ছিলেন। তাঁর হন্তি বাহিনী এত পরাক্রমশালী ছিল যে, সমুদ্র তীর পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত হয়েছিল। তাম্র শাসনে ধর্মপাল দেবের প্রশংসা বর্ণিত হয়েছে। ধর্মপাল যখন দিগ্বিজয়ে যাত্রা করতেন, তখন সৈন্যগণের পদভারে পৃথিবী প্রকম্পিত হত। স্বসৈন্য যাত্রা করলে অশ্ব খুরে ধরাভূমি ধূলি ধুষরিত হয়ে আকাশ ছেয়ে যেত। গোপেরা গোষ্ঠ, বনচরেরা বনে, শুক পাখীরা পিঞ্জিরার মধ্যে আবদ্ধ থেকেও ধর্মপালের মহিমা কীর্তন করতো। তা শুনে ধর্মপালের মূখ মন্ডল লজ্জায় অবনত হত। ধর্মপাল প্রায় সমুদয় আর্য্যাবর্ত জয় করেছিলেন। এত পরাক্রমশালী ছিলেন যে, গুর্জ্জরপতি, গৌরেন্দ্র ও বঙ্গপতি, ধর্মপাল হতে আত্মরক্ষার্থে মালব রাজ্যের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। কন্যাকুঞ্জের ব্রাহ্মনেরা তার অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। মহা সামন্তাধিপতি নারায়ণ বর্মা নারায়ণ বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করেন। বিগ্রহ সেবার ব্যয় নির্বাহ ও পূর্ণার্থে যুবরাজ ত্রিভূবন পালের মধ্যস্থতায় রাজা ধর্মপাল দেব কে ভূমি দানের জন্য অনুরোধ করেন। রাজা কোন প্রয়োজন বশতঃ পাটালীপুত্রে জয়স্কন্ধাবার স্থাপন ও সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তাঁর সেবায় রাজগণ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রাজ, রাজপুত্র, ও রাজমাতাসহ নানা বিভাগের প্রধানদের উপসি'তি ও অবহিত করে একটি পাড়া ও হাটসহ ৪টি গ্রাম দান করেন।

সে সমস্ত ব্যক্তির উপসি'তি ও সমপ্রদায়কে অবহিত করে জমি দান করা হয়, তারা হলেনঃ (১) রাজা (২) রাজনক (৩) রাজপুত্র (৪) রাজমাতা (৫) সেনাপতি (৬) বিষয়পতি (৭) ভোগপতি (৮) ষষ্ঠাধিকৃত (৯) দন্ডশক্তি (১০) দন্ড পাশিক (১১) চৌরোদ্ধরণিক (১২) দৌঃ সাধ সাধনিক (১৩) দূতখোল- গমাগমিক (১৪) অভিত্বরমাণ (১৫) হস-্যধ্যক্ষ (১৬) অশ্বাধ্যক্ষ (১৭) গবাধ্যক্ষ (১৮) মহিষাধ্যক্ষ (১৯) ছাগাধ্যক্ষ (২০) মেষাধ্যক্ষ (২১) নাকাধ্যক্ষ (২২) বলাধ্যক্ষ (২৩) তরিক (২৪) শৌল্কিক (২৫) গৌল্মিক (২৬) তদাযুক্তক (২৭) বিনিযুক্তক প্রভৃতি এছাড়া সকল রাজপদোপজীবি সকল চাটভাট জাতীয় যথাকাল বাস্তব্য লোক সকল জৈষ্ঠ কায়স্থ, মহামহত্তর দশগ্রামিক, বিষয়ব্যবহারী, করণ ও চাষীবৃন্দ।

দানকৃত জমির চতুঃ সীমা ও তাম্রপট্ট লিপিতে বর্ণনা করা হয়েছে। রাজা ধর্মপাল দেব নারায়ণ সেবায় পুন্ড্র বর্দ্ধন ভূক্তির অধিন ব্যঘ্রতটি মন্ডলের অনর্-গত মহান- প্রকাশ বিষয়ের অনর্-বর্তী ক্রৌঞ্চশ্বভ্র গ্রাম, গোপিপল্লী গ্রাম, মাঢ়াশালল্মী ও পালিতক গ্রাম এবং এর সাথে তলপাটক নামের একটি পাড়াসহ হট্টি বা হাট সমেত দানপত্র বা তাম্রপট্টলিপি সম্পাদন করেন।২৪ দশাপচার বলতে প্রাচীন ভারতীয় দন্ডশাস্ত্রে ১০ প্রকার অপচার বা দন্ডনীয় অপরাধ যেমন, চুরি, হত্যা, পরস্ত্রী হরণ, কায়িক অপরাধ, কুট ভাষণ, অপমান জনক ভাষণ, অসত্য ভাষণ ও বস'হীন ভাষণ, বাচনিক অপরাধ, পরধন লোভ, অসত্যনুরাগ ও অধর্ম চিন্তা, মানষিক অপরাধ, রাজার বিচারে এ দশ অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হিসেবে অর্থ দন্ড দিতে হত। তা ছিল রাজার প্রাপ্য। দানভূমিতে এ অর্থ দন্ডের প্রাপ্তির অধিকার পেতেন দান গ্রহীতা। খালিমপুর লিপিতেও এ দশাপচারের কথা উল্লিখিত রয়েছে।

এ তাম্র লিপিটি আবিষ্কারের পর তা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য তালিকাভূক্ত হয়। পাল আমলে ভূক্তি বা প্রদেশ গুলি কতিপয় মন্ডলে এবং মন্ডল গুলি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে বিভক্ত ছিল। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হতো একটি “বিষয়”। ধর্মপাল দেবের তাম্রশাসনে বা তাম্র লিপিতে কয়েকটি বিষয় ও মন্ডলের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, স্থালীক্কট বিষয়, আম্রষন্ডিকা মন্ডল, উড্রমন্ডল, ব্যঘ্রতটি মন্ডল, মহান্ত প্রকাশ বিষয় প্রভৃতি। খালিমপুর লিপির বর্ণনা অনুযায়ী ভোলাহাট অঞ্চল পাল যুগে পুন্ড্রবর্ধন ভূক্তির অধিন দুটি মন্ডল ও ২টি বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত ছিল। দানকৃত ক্রৌঞ্চশ্বভ্র, মাঢ়াশাল্মলি ও পালিতক এই তিনটি গ্রাম একটি পাড়া ও হাট ছিল ব্যাঘ্রতটী মন্ডলের অধীন মহন- প্রকাশ বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত। আর গোপীপ্পলী গ্রাম ছিল আম্রষন্ডিকা মন্ডলের অধীন স্থালীক্কট বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত।

আদি গোপীপ্পলী যা আধুনিক গোপিনাথপুর গ্রামসহ এর দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ বর্তমানে আমের জন্য বিখ্যাত। তাম্র শাসনখ্যাত আম্রষন্ডিকা মন্ডল নামকরণই পক্ষান্তরে বহু প্রাচীন কাল ধরেই আমের ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। আজও আমের জন্য বিখ্যাত এ অঞ্চলটিই প্রকৃতভাবে প্রমাণ করে যে, ভোলাহাট অঞ্চল কত প্রাচীন কাল হতে আমের জন্য বিখ্যাত। তাম্র শাসনে আরও একটি মন্ডল-এর অসি-ত্ব সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। তা হচ্ছে গোপিপ্পলী গ্রামের পূর্বে উড্র গ্রাম মন্ডলের পশ্চিম সীমা এবং উত্তরে একই মন্ডলের অন্তর্গত গো-পথ।

প্রসংগত উল্লেখ্য, হিন্দু রাজত্বকালে দশটি গ্রাম নিয়ে হত একটি রাজস্ব আদায় বিভাগ। দশ গ্রামের রাজস্ব আদায়কারীকে বলা হতো দশগ্রামিক। কয়েকটি দশ গ্রাম নিয়ে গঠিত হত একটি বিষয়। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে এ সমস্ত বিভাগ সৃষ্টি হয়েছিল। সে যুগে আধূনিক যুগের মত মানচিত্রের ব্যবস্থা না থাকায় বা মানচিত্র উদ্ভাবন না হওয়ায় রাষ্ট্র, জমি অথবা গ্রামের সীমানা নির্ধারিত হতো খেজুর গাছ, আইল (আলি) গর্ত, খাল মরা নদীর খাত প্রভৃতির মাধ্যমে বলে ধর্মপাল দেবের তাম্রপট্ট লিপিটি স্বাক্ষ্য দেয়।

ভোলাহাট উপজেলার ইতিহাসের আদিপর্ব -২

প্রাচীন ও মধ্য যূগীয় বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক অঞ্চল গৌড়। আদি অভিলেখের মধ্যে খ্রিঃ ৫৫৪ অব্দে উৎকীর্ণ খরি বংশীয় রাজা ঈশান বর্মনের হরাহ লিপিতে গৌড়বাসীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এ লিপি থেকে জানা যায় যে, ঈশান বর্মন সমুদ্র তীরের গৌড়দের পরাস- করেন। (গৌড়ান সমুদ্রাশ্রয়ান) প্রবোধ শিবিরে (খ্রিঃ একাদশ শতাব্দী) গুর্গি লিপি থেকেও এ উক্তির সমর্থন মেলে। এতে গৌড়ের রাজাকে সমুদ্রের জল দূর্গে বসবাসকারী বলে বর্ণনা করা হয়েছে (জল নিধি, জল দূর্গম গৌড় রাজধিশিতে)। উক্ত দু’টি প্রমাণ হতে অন্ততঃ এ সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায় যে, কোন এক সময় গৌড়ের অবস্থান উপকুলীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

 অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ গঙ্গার চরাঞ্চলে ৩০০ শতাব্দী হতে বসবাস শুরু হয় বলে উল্লেখ করেছেন। সে সূত্রে বলা যায়, ভোলাহাট-এর ভূখন্ড গঙ্গা, কালিন্দী ও মহানন্দা নদী দ্বারা গঠিত। আজকের বিল ভাতিয়া গঙ্গা নদী দ্বারা গঠিত বলে অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনা দিয়ে গেছেন। সে সূত্রে বলা যায় গঙ্গার চরাঞ্চল তথা ভোলাহাট উপজেলার খালিমপুর ও ভবানীপুর এলাকার উঁচু ভূমিতে আনুমানিক ৩০০ খ্রিঃ হতে জনবসতী শুরু হয়েছে বলে অনুমান করা যায়। গুপ্ত যুগ পরে পাল ও সেন আমলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

প্রসংগত উল্লেখ্য যে, বর্তমানের খালেআলমপুর বা খালিমপুর ও ভবানীপুর-এর লাল মাটিয়াল এলাকা ভোলাহাট উপজেলার সবচেয়ে উচুঁ ভূমি।

ঐতিহাসিক রজনীকান্ত বাবু মনে করেন পাল আমলের পূর্বে শুর বংশীয়রা এদেশ শাসন করতেন। শুর বংশীয় রাজাদের রাজত্বকালে ভাস্কর শিল্পের বিস্তর উন্নতি হয়। সে যুগের ২টি প্রস-র মুর্তি ভোলাহাট-এর ২টি স্থানে অস্তিত্ব ছিল বলে বর্ণনা করেন। তার তথ্য মতে তৎকালিন মালদহ জেলার ভোলাহাট ও ভবানীপুর নামক স্থানে দু’টি প্রস্তর প্রতিমা পাওয়া যায়। ভোলাহাট-এর মূর্তি শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্মধারী মূর্তি, বীনা পানি ও লক্ষী দেবীকে দু’পাশে রেখে দন্ডায়মান ছিল। চালে হস্তী ও অশ্বারোহী মূর্তি রয়েছে। দেব মূর্তি বস্ত্রালঙ্কারে শোভিত, উপবেত ধারিণী। পুরুষ মূর্তির পরিহিত বস্ত্র হাটুর ওপর ও স্ত্রী মূর্তির পরিহিত বস্ত্র হাটুর নিম্নদেশ স্পর্শ করেছে। বস্ত্রগুলিতে ফুল তোলা। গলার হার, হাঁসুলি ও হাতে বাউটি ছিল। মূর্তিটি নিকটবর্তী নদীতে পাওয়া যায়। নদীর তীরবর্তী কোন মন্দির নদী ভাংগনে ভেংগে যাওয়ায় মূর্তিটি পানিতে পড়ে গিয়েছিল। বর্ণিত এ মূর্তিটি এখন কোথায় তা তিনি (রজনী বাবু) উল্লেখ করেন নি।

ভোলাহাট উপজেলায় ভবানীপুর মৌজায় আরো একটি মূর্তি সম্পর্কে অবগত হওয়া গেছে। যার অসি-ত্ব ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ঐ এলাকার বর্তমানের আদর্শগ্রাম ৩নং দলদলী ইউনিয়নের বেলতলার পশ্চিম প্রানে- নাককাটিতলা নামক স্থানে বিদ্যমান ছিল। এ মূর্তিকে স্থানীয়রা নাককাটি মূর্তি বলতো। মূর্তিটি উপজেলার নিমগাছী গ্রামের কোন এক ব্যক্তির ষড়যন্ত্রে অন্যত্র পাচার হয়েছে বলে জানা যায়।

ভবানীপুরের মূর্তিটি একটি দেবীর মূর্তি। এর দু’পাশে গণেশ ও অপর একটি অজ্ঞাত মূর্তি ছিল। শেষোক্ত মূর্তিটি ভেংগে যাওয়ায়, তা কার্তিকের মূর্তি কিনা তা জানা যায় নি। দেবী মূর্তির নাক ভাংগা ও স-ন ২টি ছেদিত ছিল বলে জানা যায়। স্থানীয় হিন্দুরা একে ঠাকুরানঝি ও মুসলমানেরা নাককাটি বলে ডাকতো। প্রতিমাটি একটি বেলের গাছে ঠেস দিয়ে রাখা ছিল। পূর্বে যে এখানে একটা প্রকান্ড মন্দির ছিল তা নিঃসংকোচে বলা যায়। স্থানটি উঁচু ভূমি এবং বর্তমানে ৩নং দলদলী ইউনিয়নের অধিন বেলতলা গুচ্ছ গ্রাম বা আদর্শ গ্রামের পশ্চিম পাড়ে অবসি'ত। এখানে উত্তর দক্ষিণে সারিবদ্ধভাবে পাশাপাশি ৩টি পুকুর বিদ্যমান। এর মধ্যে মধ্যবর্তী পুকুরের পূর্ব প্রান্তে ঐতিহাসিক নাককাটি মন্দিরের অসি'ত্ব বিদ্যমান। নাক কাটি মূর্তির নামানুসারে এ স্থানের নাম করণ হয় নাককাটিতলা। ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের সময় স্থানীয় আদিবাসী হিন্দুরা ভারতে চলে যায়। ফলে দীর্ঘ দিন ধরে সেখানে কোন পূজা অর্চনা হত না।

স্থানীয় অধিবাসীরা জানায়, ১৯৯৬ সালে পুকুরের পাশে গভীর নলকূপের ড্রেন খননকালে বেশ কিছু ছোট বড় গৌড়িয়া ইট উদ্ধার করা হয়। সংগে কিছু টালীও পাওয়া যায়। এখানকার পুকুর গুলিতে গৌড়িয়া ইটের শান বাঁধানো ঘাটের অসি-ত্ব ছিল বলে স্থানীয় অধিবাসীরা জানায়। এতে সহজেই প্রমাণ হয় যে, শূর বংশীয় রাজাদের আমলে এখানে একটা জম জমাট লোকালয় ছিল। সেই আদিকাল হতে এখানে ধুম ধামের সহিত পূজা অর্চনা ধর্মকর্ম চলতো।

১৯৮৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর উপজেলার রাধানগর কলোনী গ্রামের পুরাতন খোয়ার সংলগ্ন স্থানের একটি পরিত্যক্ত কালির বেদীর তলা হতে এ লেখক উদ্ধার করেন একটি মিনিয়েচার মিউটিলেটেড “উমা মহেশ্বর” মূর্তি কষ্টি পাথরের ছোট এ মূর্তিটি ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬ খ্রিঃ কয়েকটি প্রাচীন তাম্র মূদ্রাসহ রাজশাহী বরেন্দ্র গবেষণা যাদুঘরে প্রদর্শণের জন্য প্রদান করা হয়।

এছাড়া উপজেলার সন্ন্যাসীতলা পুকুরের প্রায় ৩০০ গজ পূর্ব দিকের আম বাগানের কর্ণারে বেশ কিছু কালো পাথরের মূর্তির ভগ্নাংশ প্রত্যক্ষ করেন। এ হতে অনুমান করা যায় যে, পুরা কালে এখানে কোন দেব মন্দির ছিল।

উপজেলার বিভিন্ন স্থানের নানা আলামত হতে প্রমাণিত হয় যে, এস্থানে অতীতে আদিবাসী সনাতনীদের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল। পাল ও সেন আমলে ভোলাহাট উপজেলা ধনজনপূর্ণ সমৃদ্ধশালী, একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকালয় হিসেবে পরিগণিত হয়। ইতিহাস প্রসিদ্ধ “খালিমপুর” লিপিই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

পাল বংশীয় দ্বিতীয় বৌদ্ধ রাজা ধর্মপাল দেবের তাম্রশাসন ১৮৯৩ খ্রিঃ নভেম্বর মাসে ঐতিহাসিক গৌড় নগরীর রক্ষা দূর্গের ৬ মাইল পূর্বে সুবৃহৎ ছাটিয়া ভাটিয়া জলাভূমির বিপরীত দিকে খালিমপুর ওরফে খোলিআলমপুর গ্রামে পাওয়া যায়। মূল তাম্র পাতাটি রাজশাহীস' বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটির যাদুঘরে রয়েছে বলে এম. আবিদ আলী খান উল্লেখ করেন। গত ২৫মে ২০০৩ তারিখ এ লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিচালিত বরেন্দ্র রিসার্চ যাদুঘরের পরিচালক প্রফেসর সাইফুদ্দীন চৌধুরী’র নিকট যোগাযোগ করেন। জনাব সাইফুদ্দীন চৌধুরী জানান, তাম্রপাতটি এখানে আদৌ ছিল না। মূল তাম্রপট্টলিটি বর্তমানে কোলকাতা যাদুঘরে রক্ষিত আছে।

যাই হোক, ১৮৯৩ খ্রিঃ মালদহ জেলা কালেক্টর মিঃ উমেস চন্দ্র বটব্যাল কর্তৃক উদ্ধারকৃত ধর্মপাল দেবের রাজত্বের বত্রিশতম বর্ষের জমিদান সংক্রান্ত তাম্র পাতটি আবিষ্কার থেকে বুঝা যায় যে, রাম পালের আমলের অন্ততঃ ৩০০ বছর পূর্বে চরে বসতি শুরু হয়।

তাম্র শাসনটি উমেস চন্দ্র বটব্যাল সাহেব খালিমপুর গ্রামের মোরি বেওয়া নাম্মী জনৈক কৃষক পত্নীর নিকট হতে উদ্ধার করেন। পন্ডিত রজনীকান্ত বাবু জনৈক হরিদাস পালিতের মাধ্যমে জানতে পেরে তিনি নিজে বটব্যাল সাহেবকে তাম্র লিপিটির পাঠ উদ্ধার করে দেন। এর সম্মূখ ভাগ তেত্রিশ ও পশ্চাদ ভাগ উনত্রিশ টি পঙংক্তি লিখিত আছে।

শ্রী অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় সম্পাদিত (বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি কর্তৃক ১৩১৯ বাংলা সনে সংকলিত) গৌড় লেখমালা লিখেছে, মালদহ জেলার অন্তর্গত খালিমপুর গ্রামের উত্তরাংশে হাল চাষ করতে গিয়ে এক কৃষক ঐ তাম্র পট্টলিপি পেয়েছিল। সে ঐ তাম্রপট্ট লিপিটিকে সিঁদুর মাখিয়ে আমরণ পূজা করেছিল। কাউকে দান বা বিক্রি করতে রাজী হয়নি। প্রয়াত উমেশ চন্দ্র বটব্যাল মালদহের কালেক্টর হয়ে আসার পর এ খবর জানতে পেরে ১৮৯৩ খ্রিঃ কৃষক পত্নীর নিকট হতে তা ক্রয় করেন। পাল বংশীয় দ্বিতীয় নৃপতি ধর্মপালদেবের ভূমি দানের তাম্রশাসন, খালিমপুর-এ আবিষকৃত হয়েছিল বলে, এটি খালিমপুর লিপি নামে সর্বাধিক পরিচিত লাভ করেছে।

এ ক্ষেত্রে তাম্র লিপিটি সিঁদুর মাখিয়ে পূজা করার উপাখ্যানটি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা তৎকালিন তাম্রপাতটির মালিক ছিল একজন মুসলমান কৃষক। এ ক্ষেত্রে পূজা করার কোন প্রশ্নই আসে না বরং তাম্রপট্টটি সুন্দর ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য রক্ষা করার স্বার্থেই তাতে সিঁদুর মাখিয়ে যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। উমেশ চন্দ্র বটব্যাল তাম্র লিপিটির পাঠ উদ্ধার করেছিলেন কিন' তা অনেক অসংগতি এবং ভ্রম প্রমাদ থাকা সত্বেও এসিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায় ১৮৯৪ খ্রিঃ তা ছাপানো হয়েছিল। পরবর্তীতে অধ্যাপক কিল হর্ণ বহু যত্নে একটি বিশুদ্ধ পাঠ উদ্ধার ও প্রকাশ করেছিলেন ১৮৯৭ খ্রিঃ বলে জানা যায়।

এ ক্ষেত্রে পন্ডিত রজনীকান্ত বাবু ও শ্রী অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র মধ্যে তাম্রপট্টটির দৈর্ঘ্য প্রস' নিয়েও মহা বিতর্ক উঠেছে। বর্ণিত ২টি বিবরণ হতে দেখা যায়, রজনীকান্ত বাবু’র বর্ণিত তাম্রপট্টটি অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র দেয়া তাম্রপট্ট এর মাপ প্রসে' ২ ইঞ্চি ছোট। ফলে এর গঠণ প্রণালী নিয়ে প্রচন্ড বিতর্ক দেখা দিয়েছে। খালিমপুরের এ তাম্র শাসনে উপরের অংশের মধ্যস'লে একটি রাজ মূদ্রা সংযুক্ত এবং এর মধ্যে “শ্রীমান ধর্ম পাল দেব” কথাটি উৎকীর্ণ রয়েছে। প্রকৃত পক্ষে এটি একটি বৌদ্ধমত বিজ্ঞাপন ধর্মচক্র মূদ্রা। এর মধ্যস'লে ধর্মচক্র চিহ্ন এবং উভয় পার্শ্বে হরিণ মূর্তি অংকিত। এর ৩/৪ টি অক্ষর ছাড়া সমগ্র লিপিটি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। সমগ্র তাম্রপট্টলিপিটি সংস্কৃত ভাষায় রচিত পদ্য গদ্যাত্নক লিপি।

এ তাম্র শাসন উৎকীর্ণ করিয়ে পরমেশ্বর পরম ভট্টারক মহারাজাধিরাজ “শ্রী ধর্মপাল দেব” তার বিজয় রাজ্যের ৩২তম বছরে (শাসনকালে) অগ্রহায়ণ মাসের ১২ তারিখে পাটালিপুত্র সমাবাসিত জয়ষ্কন্ধাবার হতে শ্রী পুন্ড্রবর্ধন ভূক্তির অনর্-গত ব্যাঘ্রতটী মন্ডল সম্বন্ধে মহন্তা প্রকাশ বিষয়ে এবং স্থালীক্কট বিষয় সম্বন্ধ আম্রষন্ডিকা মন্ডলান্তবর্তি স্থানে, মহা সামন্ত অধিপতি শ্রী নারায়ণ বর্মার প্রার্থনাক্রমে, নারায়ণ বর্মা কর্তৃক “শুভস'লীতে” নির্মিত দেব কূলে প্রতিষ্ঠিত ভগবানান্ন নারায়ণের ও তার প্রতিপালক লাট দ্বিজাদির (গুজরাট দেশীয় পুজক বা ব্রাহ্মন) ব্যবহারার্থে ভূমি দান করা হয়েছিল। এতে প্রসংগক্রমে পাল রাজবংশের অভ্যুদয় কাহিনী বংশকূল, জাত ধর্মসহ নানা বিবরণ রয়েছে। এ কারণে এ তাম্রপট্ট লিপিটি বাংলার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং একটি বিশিষ্ট উপাদান বলে সুপ্রশিদ্ধ। অদ্যবধি পাল রাজগণের যে সকল শাসনলিপি আবিস্কৃত হয়েছে এর মধ্যে এটাই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন । তৎকালে এ লিপিটি এসিয়াটিক সোসাইটি কোলকাতায় রক্ষিত ছিল। বর্তমানে তা কোলকাতা যাদুঘরে প্রদশর্নের জন্য রক্ষিত আছে। পাল বৌদ্ধ রাজা (২য় নরপতি) ধর্মপালদেব আনুঃ৭৭৫-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাম্রশাসনে বলা হয়েছে, দেশের অসি'তিশীল অবস্থার আমুল পরিবর্তনের জন্য অষ্টম শতাব্দির মধ্য ভাগে বাংলাদেশের জন সাধারণ গোপাল নামের এক ব্যক্তিকে রাজপদে অধিষ্টিত করেছিলেন। অর্থাৎ ধর্মপালদেবের পিতা গোপাল দেবকে বাংলাদেশের প্রজারা তাদের রাজা নির্বাচিত করেছিলেন।

রাজা শশাঙ্কের পরের ইতিহাস অত্যন্ত দূর্যোগপূর্ণ ও অরাজকতার ইতিহাস। মাৎস্যর ন্যায়ের শত বৎসর নৈরাজ্যকাল। অসি'তিশীল অবস্থা ছিল রাজাদের। বড় মাছের দ্বারা ক্ষুদ্র মাছ গ্রাসের ন্যায় বা যুক্তির সেই অন্যায় রাজত্ব গৌড় বংগে চলছিল। যখন এ উৎপীড়ন অসহ্য হয়ে উঠে, তখন গৌড় বংগের কতিপয় সামন্ত নায়কেরা একত্রিত হয়ে মাৎস্য ন্যায় দূর করবার জন্য বপ্যট তনয় গোপালকে অধিরাজ নির্বাচিত করেন। গোপালদেবের পুত্র ধর্মপাল দেবের খালিমপুর লিপিতে তা উল্লেখ রয়েছে।

বিষয়টি বিশদভাবে বলতে গেলে বলা যায়, দেশ ব্যাপী শত বছর অরাজকতা, অনর্-দ্বন্দ ও অভ্যান্তরীণ বিদ্রোহ তথা আজ যিনি রাজা পর দিন তার ছিন্ন মস্তক ভূলুন্ঠিত অবস্থা নিরসনের ঐকান্তিক ইচ্ছার এক মহান প্রচেষ্টা স্বরূপ কোন রূপ রক্তপাতহীনতার মধ্য দিয়ে প্রায় সেই যুগীয় গণতান্ত্রিক উপায়ে গোপাল দেবকে রাষ্ট্র প্রধান মনোনিত করা হয়। ঐ তাম্রশাসন হতে আরো জানা যায় গোপালের পিতা বপ্পট ছিলেন সম-সাময়িক কালের অন্যতম যুদ্ধবিদ্যা বিশারদ।

ভোলাহাট উপজেলার ইতিহাসের আদিপর্ব -১

মুসলমানেরা এদেশে আগমনের পূর্বে এর ইতিহাস ছিল তমাশাচ্ছন্ন। কোন লিখিত ইতিহাস ছিল না বললেই চলে। মুসলমানদের আগমনের পর তবাকাত-ই-নাসিরি, আকবর নামা, রিয়াজ-উস-সলাতীন, আখবার-উল-আখইয়ার-ফি-আসরার-ইল আবরার, আইন-ই-আকবরী, রিয়াজ-উল-আউলিয়া, বাহারিস'ান-ই-গায়েবী প্রভৃতি ফার্সী ও আরবী ভাষার লেখকদের ইতিহাস ভিত্তিক লেখা হতে বঙ্গ বিজয়ী ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজীর সময় হতে সমগ্র মধ্য যুগীয় তথ্য সমৃদ্ধ ইতিহাস পাওয়া যায়। তার পূর্বের মৌয্য, গুপ্ত, পাল ও সেন আমলের ইতিহাস অন্ধকারাছন্ন। তবে সেকালের ইতিহাস বেশী নির্ভরশীল ছিল প্রাচীন ও মধ্য যুগের সাহিত্যের ওপর, রাজ রাজন্যদের প্রশসি- গাঁথার মধ্যে। আদি যুগের ইতিহাস রচনায় তাম্রশাসন, শিলালিপি ও প্রাচীন মূদ্রা (গবেষণার মাধ্যমে) বেশ সহায়তা করেছে। অতীতে পৌরাণিক কাহিনী, কাব্যের বিবরণ, লোককথা ও কিংবদন-ী বিভিন্ন খন্ড অংশ জোড়াতালি দিয়ে ইতিহাস নির্মাণ করতে দেখা যায়। এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্বিক উৎখননের ফলেও বঙ্গ ভূমির ইতিহাস সম্পর্কে অনেক নতূন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আবার ইতিহাস অসমাপ্ত অসংলগ্ন ফাঁক ফোকর ভরাট করার জন্য অনেক সময় অনেক কল্পনার আশ্রয়ও নেয়া হয়েছে। ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে বিতর্কের ঝড়ও তুলেছে।

ভোলাহাট অঞ্চলের ইতিহাস রচনা আরো কষ্টসাধ্য ও কঠিন বিষয়। ক্ষুদ্র জনপদ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় এর অসি'ত্ব খুজে পাওয়া বড়ই দুস্কর। তবে এর ইতিহাস অত্যন- সমৃদ্ধ একথা নির্দিধায় বলা যায়। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের বা গৌড় নগরীর লাগোয়া এলাকা হিসেবে এর ইতি প্রসঙ্গ টানলে সংগত কারণেই সর্বাগ্রে আসে গৌড় ও বরেন্দ্র ভূমির ইতিহাস। ভোলাহাট ছিল ঐতিহাসিক গৌড়ের উপশহর। তাই ভোলাহাট-এর ইতিহাস গৌড় নগরী কেন্দ্রীক।

ভোলাহাট-এ কোন সময় জনবসতী গড়ে উঠেছিল, তা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। এ জন্য যেতে হবে প্রাচীন ভূপ্রকৃতি, ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্ত খন্ডনে। এছাড়া এ অঞ্চলের বিভিন্ন স'ান ও গ্রামের নাম অতীতে কি ছিল, তা জানার নিমিত্তে যেতে হবে ইতিহাসের গভীরে। বাংলাদেশের ভূখন্ড সৃষ্টি করেছে এ দেশের অসংখ্য ছোট বড় নদী। ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা যে, আনুমানিক বিশ হতে বাইশ কোটি বছর আগে এ অঞ্চলটি (সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চল) সমুদ্র গর্ভে নিমজ্জিত ছিল। হিমালয়ের পলি জমে স-রে স-রে গড়ে উঠেছে এ ভূখন্ড।

মহানন্দা ও পদ্মার মধ্যবর্তী ভূ-ভাগের প্রায় ৮৪০০ বর্গ কিঃ মিঃ এলাকা বরেন্দ্র অঞ্চলের অন-র্ভূক্ত। চারি দিকে নতুন পলি গঠিত সমতল এলাকা হতে বেশ উঁচু এবং ঢেউ খেলানো এই বরেন্দ্র অঞ্চল প্রাচীন পলি দ্বারা গঠিত ও ভূ-তাত্ত্বিকভাবে খন্ডিত। বরেন্দ্রের পশ্চিমাংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ বেশ ঢেউ খেলানো এবং সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৫ হতে ৪০ মিটার উঁচু। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক পন্ডিত রজনীকান্ত চক্রবর্তীর গৌড়ের ইতিহাস মতে খ্রিষ্টিয় পঞ্চম শতাব্দীতেও সুবিস-ীর্ণ গঙ্গার জলরাশির মধ্যে হতে নতুন দ্বীপের উৎপত্তি হয়েছিল। বর্তমান যশোর, ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ, নোয়াখালী, খুলনা, চব্বিশ পরগণা ইত্যাদি জেলার উৎপত্তির বহু পূর্বে সমুদ্র গর্ভ হতে রাজশাহী, মালদহ, পূর্ণিয়া, দিনাজপুর ও রংপুর-এর উদ্ভব হয়েছে। প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে সমুদয় বঙ্গ সমুদ্র গর্ভে নিমজ্জিত ছিল।

প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ২০০ বছর পূর্বে মৌর্য রাজত্ব কালে বরেন্দ্র পুন্ড্রবর্ধনের একটা বৃহৎ প্রদেশ বা ভূক্তি ছিল। পুন্ড্র নগর বা বর্তমান মহাস্থান এই রাজ্যের রাজধানী ছিল। বরেন্দ্রসহ পুন্ড্রনগর এ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরাতন জনবসতি ছিল যা প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ বছরের প্রাচীন। পরবর্তী গুপ্ত বংশের রাজত্ব কালেও (৪০০-৬০০ খ্রিষ্টাব্দে) বরেন্দ্র অঞ্চল উল্লেখ যোগ্য জনপদ হিসেবে ইতিহাস খ্যাত।

পন্ডিত রজনীকান্ত বাবু মনে করেন খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে গৌড় নগর নির্মিত হয়েছিল। গৌড় প্রথমতঃ পুন্ড্রবর্ধনের একাংশ ছিল। গৌড় নগরী পুন্ড্র বর্ধন অপেক্ষা সনুদর ও সুশ্রী নগরী ছিল বলে রজনী বাবু বর্ণনা করেছেন। গৌড়, দেবীকোট, মহাস্থান ও পুন্ড্রবর্ধন বরেন্দ্র বিভাগের প্রধান নগর ছিল, রুকনপুর (রুক্ষিনীপুর) বরেন্দ্রের অন্য একটি নগর ছিল। প্রবাদ মুখে শুনা যায়, এখন যেখানে ভাতিয়ার বিল, সেখানে একটি নগর ছিল। জল প্লাবনে তা নষ্ট হয়ে যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ হতে ২০০ সালে মৌর্য এবং পরবর্তী পর্যায়ে গুপ্ত শাসনামলে (৩০০ - ৬০০ খ্রিঃ) বরেন্দ্র ঘন বসতিপূর্ণ অঞ্চল ছিল। সে সময়ই এ অঞ্চলের সমতল এলাকার আদি বনভূমি পরিষ্কার করে বসতি ও কৃষি ভূমিতে পরিণত করা হয়।